সাতক্ষীরা প্রতিনিধি:
‘আল্লাহর কাছে বিচার দিয়েছি, এবার রাষ্ট্রের কাছে ন্যায়বিচার চাই’—আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্যাতনের অভিযোগ তুলে এমন আকুতি জানিয়েছেন নির্যাতনের শিকার সাদিয়া সুলতানা তাহিরুন।
নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের সমর্থনে আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষে মানবাধিকার সংগঠন অধিকার-এর উদ্যোগে শুক্রবার (২৬ জুন) সকালে সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের সামনে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
বক্তব্যে সাদিয়া সুলতানা তাহিরুন অভিযোগ করেন, ২০১৮ সালের ১২ আগস্ট রাত ১টার দিকে সাতক্ষীরা পৌরসভার মুন্সিপাড়া ক্লাবের অপজিটে অবস্থিত বেঙ্গল হার্ডওয়ারের ভাড়া বাড়িতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে একদল ব্যক্তি অভিযান চালায়। ভোর সাড়ে ৪টা পর্যন্ত তল্লাশির নামে বাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়। তিনি বলেন, ঘরের এমন কোনো জিনিস ছিল না, যা অক্ষত ছিল। আসবাবপত্র, ব্যবহার্য সামগ্রীসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র তছনছ করা হয়। তাঁর ছোট এক ভাই আফজাল ও ছোট বোনের স্বামী রফিকুল ইসলাম রেজা কে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয়।
তিনি বলেন, সে সময় তাঁর দুই বোনের পরীক্ষা চলছিল। তাঁদের একজন সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। অভিযানের সময় ভয় ও আতঙ্কে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। পরিবারের নারী সদস্যদের পর্দার মর্যাদাও ক্ষুণ্ন করা হয় বলে অভিযোগ করেন সাদিয়া সুলতানা তাহিরুন
তিনি আরও বলেন, তাঁদের কোনো অপরাধ ছিল না। শুধুমাত্র একটি ইসলামী রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করার কারণেই তাঁদের ওপর এ ধরনের নির্যাতন চালানো হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
পরে তাঁকে আরও কয়েকজনের সঙ্গে আটক করে একটি স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে টানা চার দিন চার রাত রাখা হয়। এ সময় ঘুম, খাবার ও বিশ্রাম থেকে বঞ্চিত রেখে তাঁকে অন্তত নয়বার শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সাদিয়া সুলতানা তাহিরুন বলেন, বিভিন্ন সময় সাংবাদিক এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সামনেও তাঁকে অপমান করা হয়। এমন অনেক মানসিক নির্যাতন করা হয়েছে, যা আজও তিনি প্রকাশ্যে বলতে পারেন না। তাঁকে বারবার বলা হতো, নির্বাচন শেষ হলে তিনি বের হয়ে তাঁদের বিরুদ্ধে কথা বলবেন। এভাবে তাঁকে ভয়ভীতি ও তাচ্ছিল্যের মাধ্যমে মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, আটক অবস্থায় রাতে উচ্চ শব্দে গান-বাজনা বাজিয়ে তাঁকে নামাজ আদায় ও বিশ্রাম করতে দেওয়া হতো না। এতে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তবে আল্লাহ তাঁকে ধৈর্য ধারণের শক্তি দিয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন।
আবেগঘন বক্তব্যে সাদিয়া সুলতানা তাহিরুন বলেন, একদিন গভীর রাতে তাঁর স্বামী ও ভাইকে তাঁর সামনে দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তাঁকে বলা হয়, তাঁদের গুলি করে হত্যা করা হবে। একজন স্ত্রী ও একজন বোন হিসেবে তখন তিনি ভেঙে পড়েন এবং সত্যিই বিশ্বাস করেছিলেন, তাঁদের আর জীবিত দেখতে পারবেন না। পরে আদালতে তোলার সময় তাঁদের জীবিত দেখে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেন।
তিনি বলেন, “সেখানে যে নির্যাতনের শিকার হয়েছি, তার তুলনায় জেলখানাকেই আমার কাছে জান্নাত মনে হয়েছিল। আপনারা চিন্তা করুন, কতটা ভয়াবহ নির্যাতনের মধ্যে আমি ছিলাম।”
তিনি আরও বলেন, কারাগারে যাওয়ার পর জানতে পারেন, তাঁদের গ্রেপ্তারের খবর শুনে তাঁর শ্বশুর, যিনি তাঁর কাছে বাবার মতো ছিলেন, মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে মৃত্যুবরণ করেন। পরিবারের সদস্যরা শেষবারের মতো তাঁর মুখও ভাল করে দেখাতে পারেননি বলে তিনি অভিযোগ করেন।
সাদিয়া সুলতানা তাহিরুন দাবি করেন, তাঁর স্বামী আজও স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারেন না। নির্যাতনের শারীরিক ও মানসিক প্রভাব এখনো তিনি বহন করছেন। তাঁদের পরিবার সামাজিক, মানসিক ও আর্থিকভাবে চরম ক্ষতির মুখে পড়েছে। আজও তাঁদের বাড়িতে সেই ভাঙচুরের চিহ্ন রয়ে গেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বক্তব্যের শেষাংশে তিনি বলেন, “অনেকে মামলা করেছেন, অনেকেই বিচার চেয়েছেন। আমি জানি না দুনিয়ায় বিচার পাব কি না। তাই আল্লাহর কাছে বিচার দিয়েছি। এখন রাষ্ট্রের কাছে ন্যায়বিচার চাই। যারা এই নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত, তাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক বিচার করতে হবে। আমরা প্রতিশোধ চাই না, আমরা শুধু ন্যায়বিচার চাই।”