কলারোয়া প্রতিদিন নিউজ ডেস্ক :
ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত স্টিয়ারিং হাতে সড়কেই থাকেন গণপরিবহনের চালক ও হেল্পাররা (চালকের সহকারী)। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অনিয়মিত খাবার এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাবে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, চোখের সমস্যাসহ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন তারা। কিন্তু সময় ও আর্থিক সংকটের কারণে অনেকেরই চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার সুযোগ হয় না। ফলে ছোটখাটো শারীরিক সমস্যাও একসময় বড় স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রূপ নেয়।
এমন বাস্তবতায় পরিবহন শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে পাক্ষিক ‘হেলথ ক্যাম্প’ চালু করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ।
বেসরকারি হাসপাতালগুলোর সহযোগিতায় পরিচালিত এসব ক্যাম্পে চালক ও পরিবহন শ্রমিকরা পাচ্ছেন বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপত্র। এখন পর্যন্ত ১ হাজার ১২১ জন পরিবহন শ্রমিক বিনামূল্যে এ স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করেছেন।
পুলিশের এই মানবিক উদ্যোগে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন পরিবহন খাতে কর্মরত শ্রমিকরা।
ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগ জানায়, অনিয়মিত জীবনযাপন, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা এবং মানসিক চাপের কারণে পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে নানা শারীরিক জটিলতা দিন দিন বাড়ছে। এসব সমস্যার প্রভাব অনেক সময় সড়ক নিরাপত্তার ওপর পড়ে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। এ বাস্তবতা থেকে সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগ নিয়েছে ট্রাফিক বিভাগ।
গত ১৬ মে মহাখালী বাস টার্মিনালের সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে এ পাক্ষিক হেলথ ক্যাম্পের কার্যক্রম শুরু হয়। বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর সহযোগিতায় ক্যাম্পগুলোতে রক্তচাপ, রক্তে শর্করার মাত্রা (ব্লাড সুগার), প্রাথমিক চক্ষু পরীক্ষা (বেসিক আই টেস্ট)সহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ওষুধের ব্যবস্থাপত্র এবং স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে।
ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে মিরপুর ট্রাফিক বিভাগের উদ্যোগে গাবতলী বাস টার্মিনাল সংলগ্ন এলাকা, মিরপুর-১০ গোলচত্বর ও টেকনিক্যাল ক্রসিং ট্রাফিক পুলিশ বক্স; লালবাগ ট্রাফিক বিভাগের উদ্যোগে ঢাকেশ্বরী এলাকা ও ফুলবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ড; মতিঝিল ট্রাফিক বিভাগের উদ্যোগে রামপুরা পুলিশ বক্স সংলগ্ন এলাকা; উত্তরা ট্রাফিক বিভাগের উদ্যোগে কামারপাড়া ট্রাফিক পুলিশ বক্স, হাউস বিল্ডিং ট্রাফিক পুলিশ বক্স, জসিমউদ্দিন পুলিশ বক্স ও এয়ারপোর্ট গোলচত্বর; রমনা ট্রাফিক বিভাগের উদ্যোগে কাকরাইল এবং ট্রাফিক ওয়ারী বিভাগের উদ্যোগে বলধা গার্ডেন এলাকায় এই স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
এছাড়া গুলশান ট্রাফিক বিভাগের উদ্যোগে মহাখালী বাস টার্মিনালেও নিয়মিত হেলথ ক্যাম্প পরিচালিত হচ্ছে।
এখন পর্যন্ত ১ হাজার ১২১ জন পরিবহন শ্রমিক বিনামূল্যে এ স্বাস্থ্যসেবা নিয়েছেন। তার মধ্যে উত্তরা ট্রাফিক বিভাগে ৯১ জন, গুলশান ট্রাফিক বিভাগে ১২৪ জন, মিরপুর ট্রাফিক বিভাগে ২৪২ জন, তেজগাঁও ট্রাফিক বিভাগে ১৫০ জন, রমনা ট্রাফিক বিভাগে ৬০ জন, লালবাগ ট্রাফিক বিভাগে ১৪৭ জন, ওয়ারি ট্রাফিক বিভাগে ২২৫ জন এবং মতিঝিল ট্রাফিক বিভাগে ৮২ জন রয়েছে।
সেবা প্রদানকারী চিকিৎসকরা জানান, ক্যাম্পে আসা অধিকাংশ পরিবহন চালক ও হেল্পার উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ফুসফুসজনিত সমস্যা, দৃষ্টিশক্তির দুর্বলতা এবং দীর্ঘসময় বসে কাজ করার কারণে মাংসপেশি ও কোমরব্যথাসহ বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছেন। সময়মতো চিকিৎসা ও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করলে এসব রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হলেও কর্মব্যস্ততা ও আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে তারা প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত।
চলতি বছরের ১৩ জুন রাজধানীর সাতটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পাক্ষিক এ ‘হেলথ ক্যাম্প’ অনুষ্ঠিত হয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিভিন্ন গণপরিবহনের চালক ও হেল্পাররা নির্ধারিত স্থানে গাড়ি থামিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করতে আসছেন। কেউ রক্তচাপ মাপছেন, কেউ রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করাচ্ছেন, আবার কেউ চিকিৎসকের পরামর্শ নিচ্ছেন। ক্যাম্পে দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরাও আন্তরিকতার সঙ্গে তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় পরামর্শ এবং ব্যবস্থাপত্র প্রদান করছেন।
এ সময় দীন ইসলাম নামে এক বাসচালক বাসসকে বলেন, ‘পুলিশের এ উদ্যোগে আমরা খুব খুশি। আমরা গরিব মানুষ। শরীরে বড় সমস্যা না দেখা দিলে ডাক্তারের কাছে যাই না। আমি জানতাম না আমার ডায়াবেটিস আছে। আজকে পরীক্ষার পর জানতে পারলাম। আমার মতো অনেক চালক-হেল্পার আছে যারা এখান থেকে চিকিৎসা নিয়ে উপকৃত হচ্ছে।’
বাসের হেল্পার উসমান গণি নামে বাসসকে বলেন, আমার কাজ অধিকাংশ সময় দাঁড়িয়ে থাকা। এ কারণে শরীরের নানা জায়গায় ব্যথা আসে। টাকার জন্য ডাক্তার দেখাতে পারি না। এখানে বিনামূল্যে চিকিৎসা পেয়েছি। ডাক্তারও আন্তরিক।
ওমোগা হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের চিকিৎসক মোহাম্মদ ফারুক হোসেন বলেন, আমরা দুজন ডাক্তার একদিনে ৫০ থেকে ৭০ জন রোগীকে চিকিৎসাসেবা দিয়েছি। এই স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমে যারা সেবা নিতে এসেছেন, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কোমরব্যথার কথা বলেছেন। মূলত দীর্ঘ সময় একটানা বসে গাড়ি চালানোর কারণেই এ সমস্যা বেশি দেখা যাচ্ছে।
তিনি জানান, দীর্ঘদিন এভাবে বসে কাজ করলে মেরুদণ্ডের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে এবং ধীরে ধীরে ক্ষয়জনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে। এছাড়া দীর্ঘক্ষণ গাড়ি চালানোর কারণে অনেক চালক মাথাব্যথা সমস্যার কথাও জানিয়েছেন।
হেলথ ক্যাম্পের চিকিৎসকরা জানান, অনেক চালক সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত টানা গাড়ি চালান এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম বা ঘুমের সুযোগ পান না। ফলে এসব শারীরিক সমস্যা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। এছাড়া কিছু রোগীর মধ্যে স্ক্যাবিসসহ ত্বকের বিভিন্ন রোগের লক্ষণও পাওয়া গেছে। তবে, ডায়াবেটিস ও চোখের সমস্যার রোগী কম পাওয়া গেছে।
ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. মোহাম্মদ আমুদ্দিন বাসসকে বলেন, এখানে যেসব রোগী আসছেন তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে ঠান্ডা-কাশি, দুর্বলতা এবং ঘুমের সমস্যা। বিশেষ করে ধূমপায়ী চালকদের মধ্যে এ ধরনের সমস্যা বেশি।
এছাড়া শরীর ও হাত-পায়ে ব্যথা এবং কিছু চর্মরোগও পাওয়া যাচ্ছে। উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসও আছে, তবে তুলনামূলকভাবে কম। বয়স্কদের মধ্যে দৃষ্টিশক্তির সমস্যাও পাওয়া গেছে। এটি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে এবং অনেক ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার কারণ হয়ে উঠতে পারে।
এ বিষয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান বলেন, আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও সময়ের অভাবে চালকরা নিজেদের স্বাস্থ্যের প্রতি পর্যাপ্ত নজর দিতে পারেন না। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, পেশাদার চালকদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যা তুলনামূলক বেশি। বিশেষ করে অনেকের দৃষ্টিশক্তির সমস্যাও রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, একজন চালক যদি গুরুতর শারীরিক সমস্যা নিয়ে গাড়ি চালান তাহলে তা দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। এই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই আমরা চালকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে তাদের সচেতন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। যেহেতু অনেক চালক সময়ের অভাবে চিকিৎসকের কাছে যেতে পারে না, তাই আমরা চিকিৎসকদেরই তাদের কাছে নিয়ে আসার চেষ্টা করছি। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল এবং ক্লিনিকগুলোর সহযোগিতায় আমরা এই কার্যক্রম পরিচালনা করছি।
অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) বলেন, এই কার্যক্রমের জন্য আলাদা কোনো বাজেট নেই। চিকিৎসকরা স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে সেবা দিচ্ছেন। এটি মূলত মানবিক উদ্যোগ। বর্তমানে এটি পাইলট প্রকল্প হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে পরিসর বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতা পেলে আরও বড় পরিসরে কাজ করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন ডিএমপির এই শীর্ষ কর্মকর্তা।
(বাসস)