কলারোয়ায় দুগ্ধ ঘাটতি সম্প্রসারণ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ কাগজে গাভী, বাস্তবে কোরবানির ষাঁড়

কলারোয়ায় সমবায় অধিদপ্তর, ঢাকা কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন দুগ্ধ ঘাটতি সম্প্রসারণ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রকল্পের মূল লক্ষ্য অনুযায়ী গাভী ক্রয় ও দুগ্ধ উৎপাদন বাড়ানোর পরিবর্তে অনেক সুবিধাভোগী কোরবানির জন্য ষাঁড় কিনেছেন কিংবা ঋণের টাকা অন্য খাতে বিনিয়োগ করেছেন।

উপজেলার কুশোডাঙ্গা ইউনিয়নের পারিখুপি গ্রামে কলারোয়া সমবায়ের মাধ্যমে ১০০ জন সদস্যকে জনপ্রতি ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করে দুটি গাভী ও বাছুর কেনার জন্য এবং অতিরিক্ত ৪০ হাজার টাকা ঘাস চাষের জন্য ঋণ বিতরণ করা হয়। তবে অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে—এই টাকায় অনেকেই গাভী না কিনে ষাঁড় কিনেছেন, যা কোরবানির হাটে বিক্রির উদ্দেশ্যে লালন-পালন করা হচ্ছে।

জানা গেছে, এ প্রকল্পে সরকার প্রায় ২ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। অথচ একাধিক সুবিধাভোগী দাবি করেছেন, তাঁরা ঘাস চাষের জন্য বরাদ্দ ৪০ হাজার টাকা পাননি। গত জুলাই ২০২৫ সালে বড় পরিসরের এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে চেক বিতরণ করা হয়।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, অধিকাংশ সুবিধাভোগী আগে থেকেই কেনা গরুর রশিদ দেখিয়ে প্রকল্পের শর্ত পূরণের চেষ্টা করেছেন। কেউ কেউ আবার ঋণের টাকা অন্য ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সমবায় কর্মকর্তাদের দায় রয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

এদিকে, ভুক্তভোগীদের অভিযোগ—কলারোয়া সমবায় অফিস ঋণ প্রদানের সময় প্রত্যেকের কাছ থেকে ‘সার্ভিস চার্জ’ বাবদ ৬ হাজার টাকা করে আদায় করেছে।
পারিখুপি দুগ্ধ ঘাটতি সমিতির ২৫ জন সদস্যের বিষয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা গেছে, তাঁদের মধ্যে ২১ জন এখনো গাভী কেনেননি। বাকি ৪ জনের বাড়িতে থাকা ষাঁড় দুগ্ধ উৎপাদনের উপযোগী নয়। অধিকাংশ সদস্য ঋণের টাকা অন্য খাতে বিনিয়োগ করেছেন।
সমিতির সদস্য আছিয়া খাতুন বলেন, “আমরা ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা ঋণ পেয়েছি, কিন্তু এখনো কোনো গাভী কেনা হয়নি।”
আরেক সদস্য রাবেয়া খাতুন বলেন, “আগামী সপ্তাহে গাভী কেনার পরিকল্পনা আছে।”
সমিতির সাধারণ সম্পাদক গনেশ, তাঁর স্ত্রী বাসন্তীসহ আরও কয়েকজন সদস্য—ফারজানা নুরুন্নাহার আক্তার লাকী ও মো. নাছির উদ্দিন—নতুন ঋণের টাকা পুরোনো গরুর খামারে বিনিয়োগ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব গরু কোরবানির পশু হিসেবে বিক্রির প্রস্তুতি চলছে। ঋণগ্রহীতা ফারজানা নুরুন্নাহার অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করেছেন।
সমিতির সমন্বয়ক জসিম উদ্দিন মিন্টু বলেন,
“ঋণ বিতরণের দিন চূড়ান্ত তালিকা আমাদের হাতে ছিল না। উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাই তালিকা চূড়ান্ত করেছেন। ওই সময় রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের উপস্থিতিতে আমরা কথা বলতে সাহস পাইনি। ফলে অনিয়ম হয়েছে।”
এ বিষয়ে উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা অনিমেশ কুমার দাস বলেন,
“সবাই গাভী কিনেছে, আমরা সরেজমিনে দেখে এসেছি।”
সার্ভিস চার্জ নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, “নিয়ম অনুযায়ী নেওয়া হয়েছে।”
তবে তিনি স্বীকার করেন, “কেউ কেউ কোরবানির জন্য ষাঁড় কিনেছেন। অভিযোগগুলো তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। অনিয়ম প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেবুন নাহারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
স্থানীয়দের মন্তব্য—প্রকল্পের অর্থ যে উদ্দেশ্যে বরাদ্দ ছিল, সে কাজে তা ব্যবহৃত হয়নি। ফলে কাগজে-কলমে দুগ্ধ ঘাটতি পূরণ হলেও বাস্তবে এর সুফল মিলছে না। কথায় আছে—কাজীর গরু কাগজে-কলমে গোয়ালে থাকলেও বাস্তবে তার কোনো অস্তিত্ব নেই।



মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked as *