ব্রেকিং নিউজ :

কলারোয়ায় বালু উত্তোলনের হিড়িক, দেখার যেন কেউ নেই নদী-খাল, বিল ও ঘের থেকে বালু উত্তোলনের অভিযোগ, পরিবেশ ও কৃষিজমি নিয়ে উদ্বেগ


প্রকাশের সময় : অক্টোবর ২৫, ২০২৬, ১২:৩৫ অপরাহ্ন | ১২৯
কলারোয়ায় বালু উত্তোলনের হিড়িক, দেখার যেন কেউ নেই  নদী-খাল, বিল ও ঘের থেকে বালু উত্তোলনের অভিযোগ, পরিবেশ ও কৃষিজমি নিয়ে উদ্বেগ
🖼️ ফটো কার্ড তৈরি করুন

বিশেষ প্রতিনিধি: সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলায় বিভিন্ন নদী, খাল, বিল, ঘের ও পুকুর থেকে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বালু উত্তোলন বেড়ে যাওয়ায় পরিবেশের ভারসাম্য, কৃষিজমি, নদী-খালের স্বাভাবিক প্রবাহ এবং স্থানীয় সড়ক ও অবকাঠামোর ওপর সম্ভাব্য বিরূপ প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, বিভিন্ন স্থানে বালু উত্তোলন করা হলেও এসব কার্যক্রমের বৈধতা, অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত তদারকি নিয়ে স্পষ্টতা নেই। ফলে কোথায়, কী পরিমাণ এবং কোন শর্তে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ধানদিয়া চৌরাস্তা-সংলগ্ন কপোতাক্ষ নদ, কেঁড়াগাছি ইউনিয়নের কাকডাঙ্গা বিজিবি ক্যাম্পের সামনের একটি ঘের, দেয়াড়া বিল এবং কুশোডাঙ্গা এলাকার নদীসহ বিভিন্ন স্থানে বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া উপজেলার বিভিন্ন পুকুর, খাল ও জলাশয় থেকেও বালু তুলে বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। উত্তোলিত বালু সড়ক নির্মাণসহ বিভিন্ন উন্নয়নকাজ ও ব্যবসায়িক প্রয়োজনে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে স্থানীয়দের দাবি।

তবে এসব স্থানে বালু উত্তোলনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে কি না, অনুমোদিত সীমার মধ্যে থেকে উত্তোলন করা হচ্ছে কি না এবং পরিবেশ সুরক্ষার শর্ত মানা হচ্ছে কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। স্থানীয়দের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সরেজমিন তদন্তের দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।

বিভিন্ন এলাকায় বালু উত্তোলন নিয়ে প্রশ্ন

কলারোয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বালু নির্মাণকাজের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সড়ক নির্মাণ, বাড়িঘর তৈরি এবং অন্যান্য অবকাঠামোগত কাজে বালুর প্রয়োজন থাকলেও তা সংগ্রহের ক্ষেত্রে আইন ও বিধিবিধান অনুসরণ করা জরুরি। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলার কয়েকটি এলাকায় বালু উত্তোলনের কার্যক্রম চললেও সেগুলোর অনুমোদন ও তদারকি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য নেই।

বিশেষ করে কপোতাক্ষ নদের ধানদিয়া চৌরাস্তা-সংলগ্ন এলাকা, কেঁড়াগাছি ইউনিয়নের কাকডাঙ্গা বিজিবি ক্যাম্পের সামনের ঘের, দেয়াড়া বিল এবং কুশোডাঙ্গা এলাকার নদী থেকে বালু উত্তোলনের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

তাঁদের মতে, প্রতিটি স্থানে বালু উত্তোলনের ধরন, পরিমাণ, ব্যবহৃত পদ্ধতি এবং সংশ্লিষ্ট অনুমোদনের বিষয়টি যাচাই করা হলে প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে কোনো স্থানে নিয়মবহির্ভূতভাবে বালু উত্তোলন হয়ে থাকলে তা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াও সহজ হবে।

পরিবেশ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য নিয়ে উদ্বেগ

নদী, খাল ও অন্যান্য জলাশয় থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন করা হলে পরিবেশ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। অতিরিক্ত বালু উত্তোলনের কারণে কোনো কোনো এলাকায় নদীর তলদেশের গঠন পরিবর্তন, তীরবর্তী ভূমির স্থিতিশীলতা কমে যাওয়া এবং ভাঙনের ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা থাকে। একইভাবে খাল ও জলাশয়ের স্বাভাবিক গঠন পরিবর্তিত হলে পানি প্রবাহ ও স্থানীয় জলব্যবস্থাপনায় প্রভাব পড়তে পারে।

কলারোয়ার যেসব স্থানে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে, সেসব এলাকায় বাস্তবে এমন কোনো ক্ষতি হচ্ছে কি না, তা জানতে প্রয়োজনীয় কারিগরি পরীক্ষা ও পরিবেশগত মূল্যায়ন জরুরি। বিশেষ করে নদী ও খালের তলদেশ থেকে কী পরিমাণ বালু উত্তোলন করা হচ্ছে এবং এর ফলে আশপাশের ভূমি ও স্থাপনার ওপর কোনো প্রভাব পড়ছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, যথাযথ পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণ ছাড়া বালু উত্তোলন চলতে থাকলে ভবিষ্যতে পরিবেশগত সমস্যার পাশাপাশি জনসাধারণের চলাচল ও স্থানীয় অবকাঠামোও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তবে এসব আশঙ্কার বাস্তবতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট এলাকার সরেজমিন পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।

কৃষিজমি ও স্থানীয় সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা

কলারোয়া উপজেলার বহু মানুষ কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল। তাই কৃষিজমির আশপাশে বা জলাশয়সংলগ্ন এলাকায় বালু উত্তোলনের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তাঁদের আশঙ্কা, অপরিকল্পিত উত্তোলনের ফলে কোথাও জমির কিনারা ভেঙে পড়া, মাটি সরে যাওয়া কিংবা জমির স্বাভাবিক অবস্থা পরিবর্তিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে বালু পরিবহনে ভারী যানবাহন ব্যবহার করা হলে স্থানীয় সড়কের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও অপেক্ষাকৃত সরু সড়কে অতিরিক্ত ভার বহনকারী যানবাহন চলাচল করলে সড়কের স্থায়িত্ব কমে যেতে পারে। তবে কলারোয়ার উল্লিখিত এলাকাগুলোতে এমন ক্ষতি হয়েছে কি না, তা নির্দিষ্ট তথ্য ও সরেজমিন তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

স্থানীয়দের দাবি, বালু উত্তোলনের পাশাপাশি বালু পরিবহনের বিষয়টিও নজরদারির আওতায় আনতে হবে। পরিবহনের কারণে কোনো সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার দায়দায়িত্ব নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজর দেওয়া উচিত।

অনুমোদনের বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলীর বক্তব্য

এ বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া আছে। স্থানীয় পর্যায়ে উত্তোলন করে ব্যবহার করতে পারে।”

তবে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে বালু উত্তোলনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নির্দিষ্ট স্থানগুলোর অনুমোদন, উত্তোলনের পরিমাণ এবং প্রযোজ্য শর্ত সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন। কোনো এলাকায় বালু উত্তোলনের অনুমতি থাকলেও সেই অনুমতি সংশ্লিষ্ট সব স্থান ও সব ধরনের উত্তোলনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কি না, তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি।

এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অনুমোদনপত্র, অনুমোদিত স্থান ও সীমানা, উত্তোলনের পরিমাণ এবং নির্ধারিত শর্ত পর্যালোচনা করে প্রকৃত পরিস্থিতি নির্ধারণ করা যেতে পারে। একই সঙ্গে নদী, খাল, বিল, ঘের ও পুকুরের মতো ভিন্ন ভিন্ন স্থানে বালু উত্তোলনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধিবিধান অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।

প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানোর দাবি

এলাকাবাসী ও সচেতন মহলের দাবি, উপজেলার যেসব স্থানে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে, সেসব স্থানে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের সরেজমিন তদন্ত করা উচিত। তদন্তের মাধ্যমে বালু উত্তোলনের প্রকৃত চিত্র, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কার্যক্রম, অনুমোদনের বৈধতা এবং পরিবেশ ও জনস্বার্থের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা যেতে পারে।

তাঁদের মতে, নিয়ম মেনে বৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হলে তা সংশ্লিষ্ট বিধিবিধানের আওতায় পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন। অন্যদিকে অনুমোদন ছাড়া বা নির্ধারিত শর্ত লঙ্ঘন করে বালু উত্তোলনের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।

এ ছাড়া নিয়মিত তদারকি, অভিযোগ গ্রহণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরিদর্শনের ব্যবস্থা থাকলে অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলনের ঝুঁকি কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। একই সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণ ও স্থানীয় মানুষের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে বালু উত্তোলনসংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তাঁরা।

দ্রুত তদন্ত ও কার্যকর পদক্ষেপ চান স্থানীয়রা

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, কলারোয়া উপজেলার বিভিন্ন নদী, খাল, বিল, ঘের ও পুকুর থেকে বালু উত্তোলনের অভিযোগ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে কোথায় বৈধভাবে বালু উত্তোলন হচ্ছে এবং কোথায় নিয়মবহির্ভূত কার্যক্রম চলছে, তা স্পষ্ট করা হবে।

একই সঙ্গে বালু উত্তোলনের কারণে পরিবেশ, কৃষিজমি, স্থানীয় সড়ক কিংবা আশপাশের স্থাপনার ওপর কোনো বিরূপ প্রভাব পড়ছে কি না, তা পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। নিয়মবহির্ভূত কার্যক্রমের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন সচেতন মহল।

সব মিলিয়ে, কলারোয়ায় বিভিন্ন স্থানে বালু উত্তোলনের অভিযোগকে কেন্দ্র করে অনুমোদন, তদারকি ও পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়গুলো সামনে এসেছে। এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সরেজমিন তদন্ত এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা প্রয়োজন। এতে একদিকে যেমন বৈধ কার্যক্রম সম্পর্কে স্পষ্টতা আসবে, অন্যদিকে নিয়মবহির্ভূত উত্তোলন হয়ে থাকলে তা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা—বালু উত্তোলনের বিষয়টি যেন শুধু অভিযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণ করে পরিবেশ, কৃষিজমি ও জনস্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।