
শহীদ হাসান
১৯৯৭ সালে সলিমপুর গ্রামের কৃতী সন্তান ও অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী এনাম হকের নিজস্ব অর্থ, শ্রম ও মেধায় প্রতিষ্ঠিত হাজী নাছির উদ্দীন কলেজ আজ নানা সংকট ও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। একসময় প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখর থাকা এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বর্তমানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বন্ধ হয়ে গেছে বেশ কয়েকটি বিষয়ে পাঠদানও। দীর্ঘদিনের বিরোধ ও দূরত্ব পেছনে ফেলে কলেজটির হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে এখন ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালে কলেজটি প্রতিষ্ঠার পেছনে অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী এনাম হকের মূল লক্ষ্য ছিল গ্রামের ছেলেমেয়েদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করা। বিশেষ করে নারীরা যেন নিজ এলাকায় থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে পারেন, সে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন তিনি। তাঁর স্বপ্ন ছিল, এই কলেজের মাধ্যমে সলিমপুরসহ আশপাশের এলাকার শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে পড়বে এবং একটি শিক্ষিত সমাজ গড়ে উঠবে।
প্রতিষ্ঠার পর কলেজটি ধীরে ধীরে এলাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। একসময় প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থীর উপস্থিতিতে কলেজ প্রাঙ্গণ ছিল প্রাণবন্ত। ২০০৭ সালে জাতীয় পুরস্কার অর্জনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি সাফল্যের স্বীকৃতি লাভ করে বলেও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
তবে সময়ের ব্যবধানে কলেজটির সেই গৌরবময় অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১২ সাল থেকে বিভিন্ন বিরোধ, মতপার্থক্য ও পারস্পরিক দূরত্বের কারণে কলেজের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে থাকে। দীর্ঘ প্রায় ১৪ বছরে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার পরিবেশ ও অগ্রগতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। একসময় যে কলেজে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করতেন, বর্তমানে সেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক কমে গেছে। পাশাপাশি কয়েকটি বিষয়ে পাঠদানও বন্ধ হয়ে গেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, কলেজটি যে গ্রামের মানুষের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেই সলিমপুর গ্রামের অনেক শিক্ষার্থীও এখন প্রতিষ্ঠানটিতে ভর্তি হতে আগ্রহী নয় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। ফলে কলেজটির ভবিষ্যৎ এবং শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা নিয়ে নতুন করে ভাবনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে অতীতের বিরোধ ভুলে কলেজটির উন্নয়ন ও পুনর্জাগরণে নতুন করে আশার আলো দেখা যাচ্ছে। স্থানীয় গ্রামবাসী ও বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম হাজী নাছির উদ্দীন কলেজের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগী হয়েছেন। ইতোমধ্যে কলেজটিকে কেন্দ্র করে একাধিক সভা, মিছিল ও বিভিন্ন কর্মসূচিতে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখা গেছে। এতে প্রতিষ্ঠানটির প্রতি স্থানীয় মানুষের আবেগ, ভালোবাসা ও প্রত্যাশার বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, সম্মিলিত উদ্যোগ ও কার্যকর পরিকল্পনার মাধ্যমে কলেজটির শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করা সম্ভব হবে। এ জন্য স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, শিক্ষানুরাগী, অভিভাবক, প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং তরুণ সমাজকে একযোগে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি কলেজের বিদ্যমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান, শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষার্থী ভর্তিতে আগ্রহ সৃষ্টি এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া বিষয়গুলো চালুর সম্ভাবনা যাচাই করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
স্থানীয়দের মতে, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন শুধু এর পরিচালনা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব নয়; বরং প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। পারস্পরিক বিরোধ ও মতপার্থক্য দূরে সরিয়ে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎকে অগ্রাধিকার দিতে পারলে হাজী নাছির উদ্দীন কলেজ আবারও তার পুরোনো অবস্থানে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পেতে পারে।
হাজী নাছির উদ্দীন কলেজ কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি সলিমপুরের মানুষের স্বপ্ন, আবেগ, ভালোবাসা ও ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠাতার স্বপ্ন বাস্তবায়ন এবং নতুন প্রজন্মের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে কলেজটির উন্নয়ন ও পুনর্জাগরণ এখন সময়ের দাবি।
এখন প্রয়োজন বিভেদ নয়, ঐক্য; অভিযোগ নয়, সমাধান; অতীতের বিরোধ নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া। সলিমপুরের সর্বস্তরের মানুষ একযোগে এগিয়ে এলে হাজী নাছির উদ্দীন কলেজ আবারও শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠবে—এমন প্রত্যাশা স্থানীয়দের।
আমার প্রতিবেদনে পুনরাবৃত্তি কমাও
আমার প্রতিবেদনের সমাপ্তি সংক্ষিপ্ত করো
আমার প্রতিবেদনে তথ্যের ভারসাম্য আনো
আপনার মতামত লিখুন :