
**নিজস্ব প্রতিবেদক, কলারোয়া (সাতক্ষীরা)**
সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলা সদরের বিভিন্ন হোটেল ও রেস্তোরাঁয় খাবারের সঙ্গে পানি পরিবেশনের প্রচলিত পদ্ধতিতে পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। একসময় যেখানে ক্রেতাদের পানি পান করার জন্য কাচের গ্লাস ব্যবহার করা হতো, সেখানে এখন অনেক হোটেল-রেস্তোরাঁয় মিনারেল ওয়াটার বাজারজাতকারী কোম্পানির একবার ব্যবহারের উপযোগী প্লাস্টিকের (পিইটি) বোতল দিয়ে পানি পরিবেশন করা হচ্ছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব বোতল একই প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে বারবার ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সরেজমিন পর্যবেক্ষনে উপজেলার দুলালের মিষ্টি, রাজ হোটেল, জামতলা তৃপ্তি হোটেল এন্ড বিরিয়ানী হাউজ, শাহীন হোটেল, ভাগ্যকুল মিষ্টান্ন ভান্ডার সব প্রায় সব রেস্তোরায় কাচের গ্লাসের পরিবর্তে এই প্লাস্টিকের পেট বোতলে পানি পরিবেশনের চিত্র দেখা গেছে।

স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের মতে, যথাযথভাবে পরিষ্কার না করা পানির পাত্র থেকে জীবাণু ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে। আর একবার ব্যবহারের জন্য তৈরি প্লাস্টিকের বোতল নিয়মিত পুনর্ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, বোতলের ক্ষয় এবং সংরক্ষণপদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। ফলে জনবহুল বাজার এলাকার হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোতে পানি পরিবেশনের এই পদ্ধতি জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সাধারণত বাজারজাতকৃত বোতলজাত পানির প্লাস্টিকের বোতল একবার ব্যবহারের পর ফেলে দেওয়ার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়। কিন্তু কলারোয়া বাজারের বিভিন্ন খাবারের দোকানে এ ধরনের বোতল বারবার পানি পরিবেশনের কাজে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বোতলগুলোর ভেতর ও মুখ যথাযথভাবে পরিষ্কার করা হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
একই বোতল বিভিন্ন ক্রেতার ব্যবহারের উপযোগী করে বারবার পরিবেশন করা হলে বোতলের মুখ ও ঢাকনার সংস্পর্শে লালা, হাতের ময়লা এবং পরিবেশ থেকে জীবাণু স্থানান্তরের সম্ভাবনা থাকে। বিশেষ করে বোতল ঠিকমতো ধোয়া ও শুকানো না হলে স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
দূষিত পানি ও অপরিচ্ছন্ন পানির পাত্রের মাধ্যমে ডায়রিয়া, আমাশয়সহ বিভিন্ন অন্ত্রের সংক্রমণ ছড়াতে পারে। তবে শুধু একই বোতল পুনর্ব্যবহারের কারণে কোনো নির্দিষ্ট রোগ ছড়িয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে উপযুক্ত তদন্ত ও প্রমাণ প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে বোতলে কী ধরনের পানি রাখা হচ্ছে, পানির উৎস কতটা নিরাপদ, বোতল কীভাবে পরিষ্কার করা হচ্ছে এবং একাধিক ব্যক্তি একই বোতল ব্যবহার করছেন কি না—এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে অবহেলা থাকলে সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
প্লাস্টিকের বোতল দীর্ঘদিন ব্যবহার, ঘষামাজা, আঁচড়, তাপ এবং অনুপযুক্ত সংরক্ষণের ফলে প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক পানিতে মিশে যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা রয়েছে। তবে কলারোয়ার এসব বোতলের পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে কি না কিংবা তা কী পরিমাণে রয়েছে, তা পরীক্ষাগার বিশ্লেষণ ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
তারপরও একবার ব্যবহারের জন্য বাজারজাত করা বোতলকে দীর্ঘদিনের ব্যবহারযোগ্য পানির পাত্র হিসেবে গ্রহণ করা নিরাপদ অভ্যাস নয়। এ ধরনের বোতল রোদে, অতিরিক্ত তাপের কাছে বা অপরিচ্ছন্ন স্থানে রাখা হলে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

কাচের গ্লাস কি ফিরবে না?
হোটেল-রেস্তোরাঁয় কাচের গ্লাস ব্যবহার করলে প্রতিবার ব্যবহারের পর নিরাপদ পানি ও উপযুক্ত ডিটারজেন্ট দিয়ে ধুয়ে, প্রয়োজনে জীবাণুমুক্ত করে এবং পরিষ্কারভাবে সংরক্ষণ করে পুনরায় ব্যবহার করা যায়। সঠিকভাবে পরিষ্কার করা কাচের গ্লাস স্বাস্থ্যসম্মতভাবে বারবার ব্যবহারযোগ্য।
অন্যদিকে, একবার ব্যবহারের জন্য তৈরি প্লাস্টিকের বোতল দিয়ে বারবার পানি পরিবেশন করলে সেটি যথাযথভাবে পরিষ্কার করা হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে। ফলে সামান্য খরচ সাশ্রয়ের জন্য এমন পদ্ধতি গ্রহণের পরিবর্তে স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থা বেছে নেওয়া জরুরি।
কলারোয়া উপজেলা প্রশাসন, উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা প্রয়োজন। বাজারের হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোতে পানি পরিবেশনের পাত্র, পানির উৎস, পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধি নিয়মিত পরিদর্শনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
পাশাপাশি রেস্তোরাঁ মালিকদের জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সচেতনতামূলক নির্দেশনা দেওয়া, নিরাপদ পানি পরিবেশন নিশ্চিত করা এবং অনিয়ম পাওয়া গেলে প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
খাবারের মান ও পরিবেশের পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি নিরাপদ পানীয় জলও জনস্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ক্রেতাদেরও এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। হোটেল-রেস্তোরাঁয় পানি পরিবেশনের ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ পাত্র ব্যবহারের দাবি জানানো প্রয়োজন।
আপনার মতামত লিখুন :